
কানাডা, মেক্সিকো ও চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কার্যকর হওয়া এবং এর পাল্টা ব্যবস্থায় মঙ্গলবার বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়া এবং কঠোর রাজস্বনীতির আশঙ্কা মার্কিন ডলারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এর মধ্যেই নিউইয়র্ক ফেডের প্রেসিডেন্ট জন উইলিয়ামস ট্রাম্পের শুল্কের সঙ্গে যুক্ত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন, যা সুদের হার "দীর্ঘ সময়ের জন্য উচ্চ" থাকার ইঙ্গিত দেয়।
বুধবার চীনের National People's Congress-এর হালনাগাদ তথ্য বাজারের উদ্বেগ কিছুটা কমিয়েছে। চীন 2025 সালে GDP প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা 5% নির্ধারণ করেছে এবং আলোচনার মাধ্যমে US-এর সঙ্গে বাণিজ্যবিরোধ মেটানোর আগ্রহ জানিয়েছে। তবে ঘাটতি নিয়ে একটি প্রতিবেদনে আর্থিক প্রণোদনার প্রত্যাশা কমেছে। এদিকে, US-এর শুল্কের বিষয়ে বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া বাজারের আশাবাদের ওপর আরও চাপ তৈরি করেছে।
এদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন (SOTU) ভাষণে শুল্ক নিয়ে তাঁর কঠোর অবস্থানের পুনরুল্লেখ করা হয়েছে এবং দেশীয় উৎপাদকদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে, যা বাণিজ্যনীতিকে আরও প্রভাবিত করেছে।
বাজারে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তীব্র পতনের পর US Dollar Index (DXY) 2024 সালের ডিসেম্বরের শুরুর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ডলারের দুর্বলতার মধ্যে ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড এবং জাপানি ইয়েন শক্তিশালী হয়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম দুর্বল থাকা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মুদ্রার দর বেড়েছে। বাজারে অস্থিরতা বাড়লে ট্রেডাররা সোনার দিকে ঝুঁকেছেন, ফলে এর দাম এক সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এদিকে, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও শেয়ারের দামে সামান্য পতন হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের দুর্বলতা, ইউরোজোনে বেকারত্বের হার কমা এবং জার্মানিতে বিনিয়োগ বাড়ার প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে EURUSD জোড়াকে 2024 সালের নভেম্বরের শুরুর পর সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গেছে। ইউরো ট্রেডারদের নজর এখন আজ প্রকাশিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ADP Employment Change ও ISM Services PMI প্রতিবেদনের দিকে।
এদিকে, USDJPY পেয়ার দিকনির্দেশনা খুঁজে পেতে হিমশিম খেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মুদ্রা কারসাজির অভিযোগ এবং Bank of Japan-এর কর্মকর্তাদের মিশ্র মন্তব্য ইয়েনের ওপর চাপ বজায় রেখেছে। গতকাল পেয়ারটি পাঁচ মাসের সর্বনিম্নে নেমে যাওয়ার পর সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেও, এতে এখনও জোরালো গতি নেই।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং উচ্চতর করের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর UK সরকারের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও, আগের দিন GBPUSD পেয়ারটি চার মাসের মধ্যে প্রথমবার 200-SMA-এর ওপরে ক্লোজ করেছে। বুধবার পাউন্ড তিন মাসের সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি রয়েছে। দুর্বল মার্কিন ডলার এবং হতাশাজনক US পরিসংখ্যানের তুলনায় UK-এর সাম্প্রতিক উন্নত ডেটা পাউন্ডকে সমর্থন দিচ্ছে।
মার্কিন ডলারের দুর্বলতা এবং চীনের খবর আগে অস্ট্রেলিয়ান, নিউজিল্যান্ড ও কানাডিয়ান ডলারের দর বাড়াতে সাহায্য করেছিল। তবে নানা মিশ্র কারণে এখন AUDUSD, NZDUSD এবং USDCAD পেয়ারগুলো কনসোলিডেট করছে।
অস্ট্রেলিয়ান ডলার (AUD)-এর ক্ষেত্রে, RBA-র ডোভিশ দৃষ্টিভঙ্গি একটি চ্যালেঞ্জ। তবে শক্তিশালী GDP এবং RBA-র ডেপুটি গভর্নর Hauser-এর মন্তব্য কিছুটা সমর্থন জুগিয়েছে। একইভাবে, RBNZ-র ডোভিশ অবস্থান এবং গভর্নরের পদত্যাগ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে নিউজিল্যান্ড ডলার (NZD)-এর ওপর চাপ রয়েছে।
কানাডিয়ান ডলারের (CAD) ক্ষেত্রে, কানাডার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এবং দেশটির প্রধান রপ্তানি পণ্য তেলের দরপতন CAD-এর শক্তি সীমিত করছে। তবু, তেলের দামে স্থিতিশীলতা এলে CAD উপকৃত হতে পারে—এই আশায় USDCAD-এর ক্রেতারা রয়েছেন।



যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং বৈশ্বিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে, বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এর ফলে ট্রেডাররা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের দুর্বলতা এই প্রবণতাকে আরও জোরালো করছে এবং গত মাসের সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে সোনার দাম পুনরুদ্ধারে সহায়তা করছে। তবে টানা দুই দিনের দরবৃদ্ধির পর কিছুটা সতর্কতাও দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ক্রুড অয়েলের বাজারে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। American Petroleum Institute (API)-এর প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুতে অপ্রত্যাশিত হ্রাস দেখা গেলেও, টানা চতুর্থ দিনের মতো তেলের দাম কমছে। 2024 সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের পর দাম এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। মার্কিন ডলার দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও তেলের দামে সমর্থন মিলছে না। বিশেষ করে, এপ্রিলে OPEC+ উৎপাদন বাড়াতে পারে—এমন আলোচনা দামকে আরও চাপে ফেলতে পারে।
হোয়াইট হাউস ক্রিপ্টো সামিটের আগে ক্রিপ্টো বাজার কনসোলিডেট করছিল। এর ফলে সপ্তাহের শুরুতে দরপতনের পর মঙ্গলবারের শেষ দিকে বিটকয়েন (BTCUSD) ও ইথেরিয়ামের (ETHUSD) দাম ঘুরে দাঁড়ায়। তবে ক্রিপ্টো নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান এবং চলমান ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের কারণে ক্রেতারা সতর্ক রয়েছেন, যা দুই ক্রিপ্টোকারেন্সিরই ঊর্ধ্বমুখী গতি সীমিত করছে।
ট্রাম্পের শুল্ক এবং ইউক্রেন ও ইরান সম্পর্কে তাঁর অবস্থানের প্রতি বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ার দিকে বাজার নিবিড়ভাবে নজর রাখবে, কারণ এগুলো বাজারের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া, ফেব্রুয়ারির US ADP Employment Change এবং ISM Services PMI বাজারের দিকনির্দেশনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেবে। আলোচনার ভিত্তিতে ট্রাম্প কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর শুল্ক প্রত্যাহারে রাজি হলে তা বাজারে আশাবাদ তৈরি করতে পারে এবং মার্কিন ডলারের আরও শক্তিশালী হওয়ার পক্ষে সহায়ক হতে পারে—বিশেষ করে মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্য শক্তিশালী হলে।
তবে শুল্ক নিয়ে উত্তেজনা বাড়লে বা মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্য হতাশাজনক হলে ডলারের ওপর চাপ পড়তে পারে। এতে সোনার মতো নিরাপদ আশ্রয়ের সম্পদের চাহিদা বাড়তে পারে এবং EURUSD ও GBPUSD-এর দামে নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।
AUDUSD, NZDUSD, USDCAD এবং USDJPY-এর মতো কারেন্সি পেয়ারগুলো নিজস্ব অনুঘটকের কারণে মিশ্র গতিবিধি দেখাতে পারে। এদিকে, OPEC+-এর সরবরাহ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় অপরিশোধিত তেলের দামে উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কম। সামগ্রিকভাবে হতাশাজনক অর্থনৈতিক পরিবেশের মুখে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও শেয়ারবাজার নিকট ভবিষ্যতে ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খেতে পারে।
ট্রেডিংয়ে ভাগ্য আপনার সহায় হোক!