
সোনা ও মার্কিন ডলারের মতো নিরাপদ আশ্রয়ের অ্যাসেটে বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বাড়ার পর সোমবারের শুরুতে ট্রেডারদের মধ্যে কিছুটা আশাবাদ দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এবং চীন থেকে নেতিবাচক খবর না আসায় এই আশাবাদ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোজোনে অর্থনীতি মন্দায় না গিয়ে ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হওয়ার ব্যাপারে আস্থা বাড়ছে, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমাতে পারে বলেও প্রত্যাশা রয়েছে।
এর ফলে মার্কিন ডলার ও সোনার দর কমেছে। এদিকে, টানা দুই সপ্তাহ বৃদ্ধির পর USDJPY সপ্তাহের শুরুতে নিম্নমুখী হয়েছে। EURUSD, GBPUSD এবং অ্যান্টিপোডিয়ান কারেন্সি পেয়ারগুলোতে সামান্য পুনরুদ্ধার দেখা গেছে, তবে ক্রুড অয়েলের দর কমেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত ফেডের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের আর্থিক স্থায়িত্বকে আর্থিক ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়। নভেম্বরের যুক্তরাষ্ট্রের S&P PMI তথ্য ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের তুলনায় শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখায়, যা US Dollar Index (DXY)-কে নভেম্বর 2022-এর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে সহায়তা করে। তবে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান (UoM)-এর মিশ্র তথ্য এবং বাজারের সতর্ক আশাবাদ পরে DXY-কে কিছুটা নিচে নামায়। নভেম্বর মাসে UoM-এর ভোক্তা আস্থা কমে 71.8-এ দাঁড়ায়, যা 73.7-এর পূর্বাভাসের চেয়ে কম। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশায় সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়।
এ ছাড়া, ইসরায়েল-লেবানন সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির খবর ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমিয়েছে, ফলে মার্কিন ডলার ও সোনার মতো নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত অ্যাসেট দুর্বল হয়েছে। এদিকে, মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটররা মিত্র দেশগুলোকে International Criminal Court (ICC)-কে সমর্থন না করার জন্য সতর্ক করেছেন এবং সমর্থন করলে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন।
ইউরোজোনের নভেম্বরের PMI-তে ইউরো ক্রেতারা হতাশ হয়েছেন। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ECB) ডোভিশ মন্তব্য এবং জার্মানির মন্দা পুরো অঞ্চলকে টেনে নামাতে পারে—এমন আশঙ্কাও এর পেছনে কাজ করেছে। ECB-র ফ্রাঁসোয়া ভিলেরোয়া দ্য গালো বলেছেন, মূল্যস্ফীতি কমলে সুদের হার কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা অর্থনীতির জন্য একটি “সফট ল্যান্ডিং”-এর ইঙ্গিত দেয়। তবে, Deutsche Bundesbank-এর প্রেসিডেন্ট ইয়োয়াখিম নাগেল সতর্ক করেছেন যে জার্মানির স্থবিরতা আগামী বছরের শুরুটা কঠিন করে তুলতে পারে। ফলে, আজকের উত্থানের আগে EURUSD নতুন বার্ষিক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে টানা তৃতীয় সপ্তাহের পতন চিহ্নিত করেছে।
এদিকে, দুর্বল UK PMI ও খুচরা বিক্রির তথ্য এবং শক্তিশালী মার্কিন ডলারের কারণে GBPUSD একটি গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট লাইনের নিচে নেমে গেছে, ফলে টানা আট সপ্তাহের দরপতন আরও দীর্ঘ হয়েছে।
মার্কিন ডলারের দরপতন, ব্যাংক অব জাপানের (BoJ) সুদের হার বাড়ানো নিয়ে নতুন আলোচনা এবং কড়া অবস্থান ধরে রাখতে ফেডের বেগ পেতে থাকা—সব মিলিয়ে দুই সপ্তাহের র্যালির পর USDJPY দুর্বল হয়েছে। এদিকে, জাপানের সম্ভাব্য বাজার হস্তক্ষেপ এবং ক্যারি ট্রেডের কার্যক্রমও ইয়েনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের আগে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।



শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান, চীনের প্রণোদনা এবং ক্রুড অয়েলের বাড়তি দামের সমর্থনে AUDUSD ও USDCAD-এ অস্ট্রেলীয় ও কানাডীয় ডলারের সাপ্তাহিক উত্থান দেখা গেছে, যা মার্কিন ডলারের বৃদ্ধিকে উপেক্ষা করেছে। এদিকে, সাম্প্রতিক পুনরুদ্ধার সত্ত্বেও NZDUSD দুর্বল রয়েছে। এর কারণ, Reserve Bank of New Zealand-এর উল্লেখযোগ্য হারে সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা। নিউজিল্যান্ডের Q3 খুচরা বিক্রি আগের -1.2% থেকে বেড়ে QoQ -0.1% হয়েছে। তবে এই সপ্তাহে সুদের হার 50bps কমানোর জন্য RBNZ Shadow Board-এর সুপারিশ NZDUSD-এর ওপর চাপ বজায় রেখেছে, এমনকি মার্কিন ডলারের দর কমলেও।
যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের দর বাড়লেও সোনা ও ক্রুড অয়েলের ক্রেতারা পিছিয়ে যাননি। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং চীন, ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে চাহিদা শক্তিশালী ছিল।
তিন সপ্তাহের নিম্নমুখী প্রবণতা ভেঙে সোনার দাম 2023 সালের মার্চের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক উত্থান দেখিয়েছে। একইভাবে, সেপ্টেম্বরের শেষের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক উত্থান দেখা গেছে ক্রুড অয়েলে। সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় আকস্মিকভাবে মজুত বেড়ে যাওয়ার খবরও বাজারে তেমন প্রভাব ফেলেনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনে জয় এবং শিল্পখাতের নানা অগ্রগতি বিটকয়েন (BTCUSD) ও ইথেরিয়ামের (ETHUSD) ক্রেতাদের আশাবাদী করে তুলছে। এ সপ্তাহে CBoE বিটকয়েনের স্পট প্রাইসের সঙ্গে যুক্ত প্রথম ক্যাশ-সেটেলড ইনডেক্স অপশন চালু করতে যাচ্ছে। এতে ট্রাম্পকে ঘিরে আশাবাদ আরও বাড়ছে এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
এই সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের Core PCE Price Index, সর্বশেষ FOMC বৈঠকের কার্যবিবরণী এবং RBNZ-এর মুদ্রানীতির সিদ্ধান্ত। ইউরোজোন ও অস্ট্রেলিয়ার মূল্যস্ফীতির তথ্যের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের Consumer Confidence-ও নজরে থাকবে।
ফেডের হকিশ ইঙ্গিত, নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অন্যান্য অঞ্চলের ডোভিশ তথ্য মার্কিন ডলারকে শক্তিশালী রাখতে পারে। তবে সোনার দাম কমার বদলে আরও বাড়তে পারে, আর কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা না ঘটলে EURUSD ও GBPUSD-এর পুনরুদ্ধার কঠিন হতে পারে। USDJPY-তে দরপতনের সম্ভাবনা রয়েছে। ক্রুড অয়েলের দাম বাড়তি ধরে রাখার মতো শক্তিশালী অনুঘটক নেই, অন্যদিকে অ্যান্টিপোডিয়ান মুদ্রাগুলোতে সংশোধন দেখা যেতে পারে।
সোমবার অর্থনৈতিক ক্যালেন্ডারে তেমন গুরুত্বপূর্ণ সূচক নেই এবং বৃহস্পতিবার থ্যাংকসগিভিং ছুটি থাকায়, এ সপ্তাহে বাজারের ওঠানামা সীমিত হতে পারে।
ট্রেডিংয়ে ভাগ্য আপনার সহায় হোক!