
বৃহস্পতিবার বাজারে “ঘুরে দাঁড়ানোর দিন” হয়ে ওঠেনি। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, ইরান নিয়ে উত্তেজনা এবং বেশিরভাগ দুর্বল মার্কিন ডেটা সম্পর্কে মিশ্র ইঙ্গিতের মধ্যে বাজার সতর্ক ছিল। ফেড কর্মকর্তারা নরম অবস্থান বজায় রেখেছেন, যা বছরের শেষ নাগাদ সুদের হার কমার প্রত্যাশাকে আরও জোরালো করেছে। এখন প্রায় 65 বেসিস পয়েন্ট হার কমার সম্ভাবনা বাজারে বিবেচনায় রয়েছে।
বাণিজ্যসংক্রান্ত খবরে, মার্কিন কর্মকর্তারা চীনের সঙ্গে বিরল মৃত্তিকা উপাদান নিয়ে চুক্তিটিকে চূড়ান্ত চুক্তি নয়, বরং কেবল একটি “সমঝোতা” বলে বর্ণনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র EU-কে একটি নতুন বাণিজ্য প্রস্তাবও পাঠিয়েছে। তবে, মার্কিন শুল্কের জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ফ্রান্সের হুমকি এবং গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপে জাপানের চলমান বিরোধিতায় আশাবাদ সীমিত হয়েছে।
ভূরাজনীতি নিয়ে ইরানি সূত্রগুলো পারমাণবিক আলোচনা বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো সমঝোতার কথা অস্বীকার করেছে। একই সময়ে, অন্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সুরক্ষিত সুড়ঙ্গে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করেছে। এতে দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্ব অর্থনীতির মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে: জাপানের মুদ্রাস্ফীতি, খুচরা বিক্রি ও কর্মসংস্থানের তথ্য প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি, আর চীনের শিল্পমুনাফা কমেছে। US-এ বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে এবং প্রথম প্রান্তিকের (Q1) GDP-র পূর্বাভাস সংশোধন করে কমানো হয়েছে। এর বিপরীতে, টেকসই পণ্যের অর্ডার প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ছিল এবং বেকারভাতার দাবি কমেছে।
ফেড কর্মকর্তারা পাওয়েলের আগের “অপেক্ষা করে দেখা” অবস্থানেরই প্রতিধ্বনি করেছেন, ফলে ডোভিশ নীতির প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। এদিকে, নিউজিল্যান্ডে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বেড়েছে এবং কানাডায় গড় সাপ্তাহিক আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা Bank of Canada-র হকিশ অবস্থানকে সমর্থন করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের Strategic Petroleum Reserve (SPR)-এ তেল যোগ করার কাজে বিলম্বের খবরের পর ক্রুড অয়েলের দাম সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেও, সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমে আসা এবং OPEC+-এর উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনায় ঊর্ধ্বমুখী গতি দুর্বল ছিল। দুর্বল US Dollar Index (DXY) সত্ত্বেও সোনার দরপতন অব্যাহত থেকে মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে, প্রায় $3,280-এ নেমেছে। DXY এখন ফেব্রুয়ারি 2022-এর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
আজকের গুরুত্বপূর্ণ US Core PCE Price Index প্রকাশের আগে প্রধান মুদ্রা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ডলার এবং শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধি থেমেছে। মূল্যস্ফীতি পরিমাপের এই সূচকটিকেই Fed সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এদিকে, স্বল্প সময়ের দরপতনের পর ক্রিপ্টোকারেন্সির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আবার শুরু হয়েছে।
2021 সালের শেষ দিকের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর ইউরো ও পাউন্ডের দর কিছুটা কমেছে। জার্মানির দুর্বল ভোক্তা আস্থা, যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ বাণিজ্য নিয়ে মিশ্র খবর এবং ECB-র সতর্ক মন্তব্য EURUSD-এর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, ফলে এর টানা ছয় দিনের দরবৃদ্ধির ধারা থেমেছে। 2021 সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর GBPUSD-ও কিছুটা রক্ষণাত্মক হয়েছে। তবে মার্কিন ডলারের সার্বিক দুর্বলতা, যুদ্ধবিরতির খবর ঘিরে বাজারের স্বস্তি এবং সাম্প্রতিক টেকনিক্যাল ব্রেকআউটের কারণে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সম্ভাবনা অটুট রয়েছে।
এদিকে, এক সপ্তাহের সর্বনিম্নে নেমে যাওয়ার পরও USDJPY চাপের মধ্যে রয়েছে। জাপানের মূল মূল্যস্ফীতি চার মাসের মধ্যে প্রথমবার কমেছে, খুচরা বিক্রির প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে এবং বেকারত্বের হার 2.5%-এ অপরিবর্তিত রয়েছে। এর আগে জাপানি সরকারি বন্ডের (JGBs) জোরালো চাহিদা BoJ-এর সুদের হার বাড়ানোর প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। ডলার দুর্বল থাকায় এতে USDJPY-এর দরপতন আরও বেড়েছে।
টানা চার দিনের দরবৃদ্ধির পর AUDUSD ও NZDUSD-এর গতি কমেছে। Fed-এর গুরুত্বপূর্ণ মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের আগে বাজারে সতর্কতা বেড়েছে। নিউজিল্যান্ডে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা শক্তিশালী থাকায় NZDUSD কিছুটা সমর্থন পাচ্ছে। এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় দৈনিক পতনের পর USDCAD-এ চাপ অব্যাহত রয়েছে। কানাডার শক্তিশালী তথ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য নিয়ে আশাবাদ এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে, যা BoC-এর সুদের হার কমানো স্থগিত রাখার সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। তবে, অপরিশোধিত তেলের দাম কমায় USDCAD-এর পতন সীমিত হচ্ছে, কারণ তেল কানাডার অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য।



Gold প্রায় $3,280-এর কাছে 6 মাসের ঊর্ধ্বমুখী ট্রেন্ডলাইনের দিকে এগোচ্ছে এবং টানা দ্বিতীয় সপ্তাহে লোকসানের মুখে রয়েছে। দুর্বল US Dollar এবং চীন থেকে চাহিদা বাড়ার লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও এমনটি হচ্ছে। আরেকটি প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে Gold ইউরোকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থানে উঠে এসেছে। তবু, মে-জুনে অতীতে দেখা দরপতন এবং $3,435 রেজিস্ট্যান্স ভাঙতে বারবার ব্যর্থ হওয়ায় ধাতুটির ওপর চাপ বজায় রয়েছে।
সোনার মতো অপরিশোধিত তেলের দামও দুর্বল US dollar থেকে লাভবান হতে পারছে না। এর পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কমে যাওয়া, OPEC+ উৎপাদন বাড়াতে পারে এমন প্রত্যাশা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও রাজনৈতিক নীতি নিয়ে উদ্বেগ। 2025 সালের SPR সরবরাহে বিলম্বের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের মন্তব্যের পর দামে সামান্য উত্থান হয়েছিল, তবে এর প্রভাব খুব বেশি ছিল না।
এদিকে, Bitcoin (BTCUSD) ও Ethereum (ETHUSD) ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং আগের দিনের দরপতন পুষিয়ে নিচ্ছে। ইতিবাচক শিল্পখাতের খবর, দুর্বল ডলার এবং ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর আশাবাদের কারণে ক্রিপ্টো বাজারের মনোভাব উন্নত হয়েছে।
শুক্রবারের শুরুটা শান্ত থাকলেও, ECB, BoE ও Fed-এর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা বক্তব্য দেওয়ায় ইউরোপীয় ও US সেশনে বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। সবার নজর থাকবে মে মাসের US Core PCE Price Index-এর দিকে—মুদ্রাস্ফীতি মাপার ক্ষেত্রে Fed-এর পছন্দের সূচক এটি। তথ্য-উপাত্তে মূল্যচাপ কমার ইঙ্গিত মিললে US Dollar আরও দুর্বল হতে পারে। এতে প্রধান মুদ্রা, অ্যান্টিপোডিয়ান মুদ্রা এবং কমোডিটির দাম বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির ইঙ্গিত পেলে অপরিশোধিত তেলের দরপতন থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গতি বাড়তে পারে। অন্যদিকে, নতুন করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে সোনার দামকে $3,280 থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আরও ওপরে বন্ধ হতে হবে—যা আপাতত সম্ভাবনাহীন বলেই মনে হচ্ছে। শেয়ারবাজার ও ক্রিপ্টোকারেন্সি দৃঢ় থাকতে পারে, আর US বাণিজ্য বা ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে নেতিবাচক চমক না এলে বন্ডের ইল্ড কমতে পারে।
ট্রেডিংয়ে ভাগ্য আপনার সহায় হোক!